১৯৯২ সালের আজকের দিনেই উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতেই ধ্বংস হয় ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ



মোহাম্মদ সলিমুল্লাহ, বি.বি নিউজ ৩৬৫ঃ১৯৯২ সালের এইদিনে (৬ ডিসেম্বর) উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা হয়েছিল। তাৎক্ষণিক সৃষ্ট দাঙ্গায় কমপক্ষে ২ হাজার লোক নিহত হন এবং প্রায় ৯,০০০ কোটি ভারতীয় রুপির (৩৬০ কোটি মার্কিন ডলার) সম্পদ বিনষ্ট হয়। কিন্তু ২০২০ সালে প্রদত্ত ঐ মামলার রায়ে কেউই দোষী সাব্যস্ত হয়নি।
.
অযোধ্যা ১৫২৮ সালে মুঘল শাসনের আওতাভুক্ত হয়। অধিকারের পর সেনাপতি মীর বাকি সম্রাট বাবরের নামে “বাবরি মসজিদ” নির্মাণ করেন। প্রায় চার শতাব্দী ধরে মসজিদটিতে মুসলিমরা সালাত আদায় করেছে। পার্শ্ববর্তী জমিতে হিন্দুরা প্রার্থনা করেছে। কখনও কোনো বিবাদ-বিসম্বাদ হয়নি।
.
কিন্তু ১৮২২ সালে প্রথমবারের মতো ফৈজাবাদ আদালতের এক চাকরিজীবী দাবি করেন যে, মসজিদটি মন্দিরের জমির উপরে অবস্থিত। নির্মোহী আখড়া সংগঠন ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ঐ জমির উপরে তাদের দাবি জানায়। ১৮৫৫ সালে ঐ ভূখণ্ডের দখল নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।
.
১৮৫৯ সালে সংঘর্ষ এড়াতে ব্রিটিশ সরকার দেয়াল দিয়ে হিন্দু ও মুসলিমদের প্রার্থনার স্থান পৃথক করে দেয়। ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। ১৯৪৯ সালে হিন্দু মহাসভার সদস্যরা মসজিদের অভ্যন্তরে রাম মূর্তি স্থাপন করতে গেলে দুই পক্ষের মাঝে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং তারা আইনের আশ্রয় নেয়।
.
তখন সরকার মসজিদটিকে বিতর্কের বিষয় বলে অভিহিত করে এবং মসজিদের দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়। আশির দশকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) তাদের রাজনৈতিক সহযোগী ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) সাথে নিয়ে ঐ স্থানে রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য ইন্ডিয়াব্যাপী প্রচারাভিযান চালায়।
.
১৯৮৬ সালে ডিসট্রিক্ট কোর্ট মসজিদের তালা খোলা এবং সেখানে হিন্দুদের প্রার্থনা করার পক্ষে রায় দেন। আদালতের রায়কে সাধুবাদ জানান কংগ্রেস নেতা ও তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। তিনি শাহ বানো বিতর্কে গোঁড়া হিন্দুদের সমর্থন হারানোর পর পুনরায় তাদের সমর্থন লাভে উদ্যত হয়েছিলেন।
.
১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরে বিজেপি নেতা এল.কে আদভানি রাম রথযাত্রা নামে একটি রাজনৈতিক শোভাযাত্রা আয়োজন করেন। যাত্রাটি গোটা উত্তর ভারত ঘুরে অযোধ্যাতে এসেছিল। এই শোভাযাত্রা প্রস্তাবিত মন্দিরের জন্য সমর্থন আদায় এবং মুসলিমবিরোধী মানসিকতাকে কাজে লাগিয়ে হিন্দুদের অর্জনে কাজ করেছিল।
.
শোভাযাত্রা অযোধ্যায় পৌঁছানোর পূর্বে বিহার সরকার আদভানিকে গ্রেফতার করে। তত্থাপি ‘করসেবক’রা অযোধ্যায় পৌঁছে যায় এবং মসজিদে হামলা করে। এখানে আধাসামরিক বাহিনীর সাথে সংঘর্ষ হলে কিছু করসেবক নিহত হন। এতে তাদের জনসমর্থন ব্যাপক বৃদ্ধি পায় এবং পরবর্তী নির্বাচনে তারা সরকার গঠন করে।
.
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (RSS) ও সহযোগী সংগঠনগুলো ঐ স্থানে আবার এক শোভাযাত্রা আয়োজন করে। শোভাযাত্রায় শামিল হয়েছিল হিন্দু পরিষদ ও বিজেপির দেড় লাখ “কর সেবক”। অনুষ্ঠানে আদভানি, মুরলি মনোহর জোশি ও উমা ভারতীর মতো বিজেপি নেতা ভাষণ দিয়েছিলেন।
.
স্থানটির চতুর্দিকে পুলিশি বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু দুপুর নাগাদ উন্মত্ত জনতা সেই বেষ্টনী অতিক্রম করে, মসজিদের উপরে উঠে গেরুয়া পতাকা উত্তোলন করে এবং কুঠার, হাতুড়ি ও গাঁইতি দিয়ে ইমারতটি ভাঙা শুরু করে। কোনো বাধা ছাড়া একটানা কয়েক ঘণ্টার হামলায় মসজিদটি মাটির সাথে মিশে যায়।
.
ঘটনার পর ফৈজাবাদ জেলা পুলিশ ২টি এফআইআর দায়ের করে। এতে অজ্ঞাতনামা লাখো করসেবকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়। লখনউ ও রায়বরেলি আদালতে ২টি এফআইআরের বিচার শুরু হয়। ৪৮জন নেতার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাও মসজিদ ধ্বংসে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনে।
.
১৯৯৩ এর অক্টোবরে যৌথ চার্জশিট দেয় সিবিআই। এতে দোষী নেতাদের মধ্যে নাম ছিল লালকৃষ্ণ আদভানী, মুরলী মনোহর জোশী, উমা ভারতী, কল্যাণ সিং, বিনয় কাটিয়ার, সাক্ষী মহারাজ, সাধ্বী ঋতম্ভরা , নৃত্য গোপাল দাস, চম্পত রাই, অশোক সিঙ্ঘল, গিরিরাজ কিশোর, বিষ্ণুহরি ডালমিয়া, শিবসেনা সুপ্রিমো, বাল ঠাকরে।
.
২০০৫ সালে সাবেক গোয়েন্দা প্রধান মলয় কৃষ্ণ ধর দাবি করেন যে, আরএসএস, বিজেপি ও ভিএইচপি নেতারা ইমারতটি ভাঙার জন্য দশ মাস পূর্বেই পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি নিজেই বিজেপি ও সংঘ পরিবারের ব্যক্তিদের একটি বৈঠকে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন যেখানে মসজিদ ভাঙ্গার নীল নকশা করা হয়েছিল।
.
মলয় দাবি করেন- তিনি সেই বৈঠকের কথাবার্তা রেকর্ড করে উপরের কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করেছিলেন, যা প্রধানমন্ত্রী (নরসীমা রাও) ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (শঙ্কর রাও চবন)কে অবহিত করা হয়েছে। “অযোধ্যার ঘটনা হিন্দুত্ববাদকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে অনন্য সুযোগ হিসেবে কাজ করেছে”।
.
২০০৯ সালে লিবারহান কমিশনের প্রতিবেদনে বাবরি মসজিদ ধ্বংসে ৬৮ জনকে দায়ী করা হয়, যাদের অধিকাংশ ছিলেন বিজেপি নেতা। দোষী ব্যক্তিদের নামের তালিকায় বাজপেয়ী, আদভানি, জোশি ও বিজয় রাজ স্কিন্দিয়ার নাম ছিল। সেখানে উত্তর প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংয়ের সমালোচনা করা হয়।
.
প্রতিবেদনে ইমারত ভাঙার সময় অযোধ্যার পুলিশ ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার কথা উল্লেখ করে হয়। আদভানি ও জোশির বক্তব্য জনতাকে আরো উন্মত্ত করে তোলে বলে উল্লেখ করা হয়। নেতাদের ভূমিকা তাদের মনের গহীনে বিতর্কিত ইমারতটি ভাঙার সুপ্ত ইচ্ছাকেই ফুটিয়ে তোলে- বলে উল্লেখ করা হয়।
.
২০১৪ সালের এপ্রিলে কোবরাপোস্ট এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, ধ্বংসযজ্ঞ শুধু উন্মত্ত জনতার কাজ ছিল না, এটা ছিল পূর্ব পরিকল্পিত এবং এর ভিত রচিত প্রচণ্ড গোপনীয়তার মাঝে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও শিব সেনা সদস্যরা ইমারতটি ধ্বংসের কয়েক মাস পূর্বেই ইমারতটি ধ্বংসের পরিকল্পনা করেছিল।
.
২৮ বছর পর, ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত রায় দিয়েছে। আধভানী, মনোহর জোশী, উমা ভারতী, কল্যাণ সিং, সাধ্বী ঋতম্ভরা, সাক্ষী মহারাজ-সহ ৩২ জন অভিযুক্তকেই বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। বিচারক এস.কে যাদব রায়ে বলেন, আধভানী, জোশীরা বরং বাবরি মসজিদ বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন।
.
অথচ সেই শোভাযাত্রায় উত্তেজক ভাষণের হাজারো ভিডিও ও সংবাদপত্রের রিপোর্ট রয়েছে; নেতা-নেত্রীদের সোচ্চার কণ্ঠে- “এক ধাক্কা আওর দো”র প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু বিচারক জানিয়েছেন, “আদালতের কাছে জমা দেয়া অডিও ও ভিডিও পরিষ্কার নয়। বরং কিছু অসামাজিক লোক মসজিদের পিছন থেকে এসে মসজিদ ভেঙেছে।

error: