মক্কা থেকে হজ্ব করে ফিরেই স্বাধীনতা সংগ্রামে নেমেছিলেন বীর শহীদ তিতুমীর, জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য



বি.বি নিউজ ৩৬৫ ডিজিটাল ডেস্ক : তিনিও স্বাধীনতা সংগ্রামী। এই জানুয়ারিতেই ২৭ তারিখে তার জন্মদিন। এই বাংলারই স্বাধীনতা সংগ্রামী তিনি। কিন্তু তাকে নিয়ে আজকাল আর আলোচনা হয় না। কোথাও যেন হা’রিয়ে গিয়েছে বাঁশের কেল্লা গড়ে তিতুমিরের ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক লড়াইয়ের ইতিহাস। সেই তিতুমীর যার প্রকৃত নাম ছিল মীর নিশার আলি, তিনি সৌদি থেকে হজ্ব করে ফিরে নেমে পড়েছিলেন ইংরেজদের বি’রু’দ্ধে সশ’স্ত্র বিপ্লবে।

তিতুমীরের জন্ম হয় ১৭৮২ সালের ২৭ জানুয়ারি বর্তমান উত্তর চব্বিশ পরগণায় জেলার বসিরহাট মহকুমা, বাদুরিয়া থানার অন্তর্ভুক্ত হায়দারপুর গ্রামে। তিনি সম্পূর্ণ ভাবে এক কৃষক পরিবারের সন্তান ছিলেন। ১৮২১ খ্রী: তিতুমীর মক্কায় হজ করতে যান, সেখানে গিয়ে স্বাধীনতা অন্যতম পথপ্রদর্শক সৈয়দ আহমেদের সঙ্গে দেখা হয়। পরে সৈয়দ আহমেদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন তিনি, ওয়াহাবি মতবাদে অনুপ্রাণিত হন। এরপর তিনি মক্কায় থেকে ফিরে এসে তিতুমীর তার গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের সাথে নিয়ে জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকরদের বি’রু’দ্ধে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করেন।

১৭৫৭ সালে পলাশীর যু’দ্ধের পর বাংলা বিহার উড়িষ্যা কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে ভারতের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এই আদি’পত্য প্রতিষ্ঠার স্থাপনের ফলে মধ্যবিত্ত, কৃষক, তাঁতি কারিগর ও শিল্পী প্রভৃতি মানুষজন সমস্যায় সম্মুখীন হয়। কারণ ইংরেজদের এই আধি’পত্য স্থাপনের মৃল লক্ষ্য ছিল সামাজ্যেবা’দী ব্যাণিজ্যিক স্বার্থ ছিল। এরফলে কোম্পানির সরকার প্রবর্তিত নতুন রাজস্ব নীতি ও ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা, চিরাচরিত বিচারব্যবস্থা স্থলে নতুন বিচারব্যবস্থা ও আইনকানুন প্রবর্তন এবং ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ ভারতবাসীর মনে তী’ব্র প্রতি’ক্রিয়া সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে শিল্প বি’প্লবের জেরে ব্রিটেনের কলকারখানায় ব্যপক হারে ভোগ্যপণ্য উত্‍পাদিত হতে থাকে। এর ফলে ভারতীয় পণ্য উপর উচ্চ হারে কর ভার চাপিয়ে সরকার বিভিন্ন ছলে কৌশলে ভারতীয় শিল্পের ধং’সের মুখে ঠেলে দেয়। ফলে বিভিন্ন কুটীরশিল্প ধং’স হয়ে যায়। এইসময়ে বেকার কৃষক, তাঁতি, কারিগর, শিল্পী প্রভৃতি সাধারণ মানুষ এক বিদ্রো’হে সামিল হয়। এর থেকে বিভিন্ন ব্রিটিশ বিরো’ধী সশ’স্ত্র আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে।

এই সব বিদ্রো’হ আন্দোলনের প্রধাননেতা তিতুমীরের নেতৃত্বে ‘বারাসাত বিদ্রোহ’ তিতুমীরের আন্দো’লনের জেরে জমিদার ও নীলকর সাহেবরা আ’ত’ঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। জমিদার, নীলকরসাহেব ও ব্রিটিশ সরকার তিতুমীরের আন্দো’লনের বি’রু’দ্ধে সমবেত হয়ে ঘোষণা করে দিয়েছিল, ‘যারা তিতুমীরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করবে ও দাড়ি রাখবে তাদের জরি’মানা দিতে হবে। তিতুমীরকে বাড়িতে স্থান দিলে বাড়ি ঘর থেকে উচ্ছে’দ করা হবে।’

দমে থাকেননি তিতুমীর। সশ’স্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত ছিল তিতুমীরের সেনা। ১৮৩১ সালে ২৩ অক্টোবর উত্তর চব্বিশ পরগণায় জেলায় বারাসাতের কাছে বাদুরিয়ার থেকে ১০ কিলোমিটার দূরত্বে নারিকেলবেড়িয়া গ্রামে তিনি বাঁশের কেল্লা তৈরী করেন। বাঁশ ও মাটি দিয়ে তৈরী বাঁশের কেল্লা তৈরী করেন। এই কেল্লা ছিল তিতুমীর ও তার সহ আন্দোলনকারীদের সদর দফতর। তিতুমীর চব্বিশ পরগণা, নদীয়া, এবং ফরিদপুর (বাংলাদেশ) বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অধিকার নিয়ে বিভিন্ন জমিদার ও ব্রিটিশ শা’সণের বি’রু’দ্ধে স্বাধীনতা ঘোষনা করেন।

স্থানীয় জমিদার ও ব্রিটিশ বাহিনী তিতুমীরের কাছে বেশ কয়েকবার পরাজয় হয়। শোনা যায় তিতুমীরের বারাসাত বিদ্রো’হে প্রায় ৮৩ হাজার কৃষক সেনা যোগদান করেছিল। ১৮৩১ সালে এই বিদ্রো’হের দ’মনের উদ্দশ্যে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক তিতুমীরের বি’রু’দ্ধে এক অভি’যান শুরু করেন। প্রথমে ব্রিটিশ সৈন্যরা তাদের চারিদিকে ঘিরে ফেলেছিল।

ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায়, তিতুমীর স্বাধীনতা প্রসঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন, ‘ভাই সব, একটু পরেই ইংরেজ বাহিনী আমাদের কেল্লা আ’ক্রমণ করবে, লড়া’ইয়ে হার জিত আছেই, এতে আমাদের ভ’য় পেলে হবে না। শহীদ হওয়ার মর্যাদা অনেক, তবে এই ল’ড়াই আমাদের শেষ ল’ড়াই নয়, আমাদের কাছে থেকে প্রেরণা পেয়েই এদেশের মানুষ একদিন দেশ উদ্ধার করবে, আমরা যে ল’ড়াই শুরু করলাম, এইপথ ধরেই একদিন দেশ স্বাধীন হবে।’

তলোয়ার ও হালকা অ’স্ত্র, ব’ল্লম, ব’র্শা, ও লাঠি এইসব নিয়ে তিতুমীর ও তার অনুগামীরা সৈন্যদলেরা ব্রিটিশদের আধুনীক অ’স্ত্রের সামনে দাঁড়াতে পারেনি। এর কারণ ব্রিটিশ দের উন্নতমানের অ’স্ত্র থাকার ফলে হা’র নিশ্চিত ছিল তিতুমীরদের। শেষে কামানের আ’ঘ’তের বাঁশের কেল্লা ধং’স হয়। এরফলে তিতুমীর ও তার অনেক অনুগামীরা বীরের মত যু’দ্ধক্ষেত্রে প্রা’ণ দেন। তিতুমীরের বাহিনী প্রধান মাসুম খাঁকে ফাঁ’সি দেওয়া হয়। এছাড়া অনেককেই দীর্ঘমেয়াদে কা’রাদ’ন্ডে দ’ণ্ডি’ত করা হয়েছিল। বহুসংখ্যক অনুসারিসহ তিতুমীর যু’দ্ধে শহীদ হন ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর।

error: